বাংলাদেশের উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ অনুমোদন পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং বাংলাদেশ বনজ শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন অধ্যাদেশ ২০২৬। পাশাপাশি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ‘হার্ট ন্যাশনালি ডিটারমাইন কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি-৩)’ ভূতাপেক্ষও অনুমোদন পেয়েছে।
বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এই তথ্য জানান। এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তেজগাঁওয়ের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে, যেখানে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশে পরিবর্তন: বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে ইতিবাচক প্রভাব
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা সংশোধন অধ্যাদেশে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ বিবেচনায় ডাটা লোকালাইজেশন সংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে কেবলমাত্র ‘ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ক্ষেত্রে দেশেই ডাটা সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকবে। ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষায় কিছু শিথিলতা আনা হয়েছে এবং কোম্পানির ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ও ক্লাউডভিত্তিক সেবায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিল্পকলা একাডেমির আধুনিকায়ন: সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত
শিল্পকলা একাডেমি সংশোধন অধ্যাদেশে একাডেমির বিভাগ সংখ্যা বৃদ্ধি করে নয়টি বিভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে থিয়েটার, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, নৃত্য ও পারফরম্যান্স আর্ট, সংগীত, চারুকলা, গবেষণা ও প্রকাশনা, নিউ মিডিয়া এবং কালচারাল ব্র্যান্ডিং ও উৎসব প্রযোজনার জন্য পৃথক বিভাগ। একাডেমির বোর্ডে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বনজ শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন: পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো
বাংলাদেশ বনজ শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর মাধ্যমে ১৯৫৯ সালের ফরেস্ট ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন অর্ডিন্যান্সকে যুগোপযোগী করা হয়েছে। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, পণ্য বৈচিত্র্য, শোরুম স্থাপন ও যৌথ উদ্যোগের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। গত অর্থবছরে কর্পোরেশন কর-পূর্ব মুনাফায় ৫৩ কোটি টাকা অর্জন করেছে এবং রাবার শিল্পে প্রথমবারের মতো ৬ কোটি টাকা লাভ করেছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন: গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে নতুন লক্ষ্য
‘হার্ট ন্যাশনালি ডিটারমাইন কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি-৩)’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২২ সালে ২০২.০৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করেছে, যা ২০৩৫ সালে ৪১৮.৪০ মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে। এই লক্ষ্য অনুযায়ী ৮৪.৯৭ মিলিয়ন টন নির্গমন হ্রাস করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার ২৬.৭৪ মিলিয়ন টন নিজস্ব সক্ষমতায় এবং বাকি ৫৮.২৩ মিলিয়ন টন আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে অর্জিত হবে।
প্রভাব ও গুরুত্ব
এই অধ্যাদেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় নমনীয়তা বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে, শিল্পকলা একাডেমির সংস্কারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পাবে, বনজ শিল্প উন্নয়নে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দেশের অঙ্গীকার শক্তিশালী হবে। এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের সুদূরপ্রসারী উন্নয়নের পথে নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।